বই পড়া ~ আমার বেড়ে উঠাতে যা ছিলোনা

You are currently viewing বই পড়া ~ আমার বেড়ে উঠাতে যা ছিলোনা

বই পড়া নিয়ে জর্জ আর আর মার্টিন এর একটা কথা খুব করে মনে পড়তেছে এ লেখার শুরুতে, A reader lives a thousands lifes before he dies. The man who never reads lives only one.

সাল ২০০০, আমার যখন তিন বছর বয়স, আমার ছোট বোনের জন্ম হলো। আমরা তিন মাস মায়মনসিং থাকার পর বাসায় আসলাম। শুধু আব্বু চাকরির জন্য রয়ে গেলো। তাই, আম্মু দুই সন্তানকে ঠিকমত সময় দিতে পারবেনা ভেবে আমাকে খালামনির কাছে রেখে আসলো। খালামনি সেই সময় এমন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পড়তো। আমার এখন কার যত সেন্স অফ হিউমর থেকে শুরু করে ডিপ্লি চিন্তা করার অভ্যাস তা আমার মনে হই খালামনির কাছ থেকেই পাওয়া। শুনা যাই, সে অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী ছিলো, যদিও পরে আর পড়াশুনা টা কন্টিনিউ করতে পারেনাই।

যাইহোক, সে আমার বেড়ে উটার গতি ডিটেক্ট করতে পেরেছিলো। তার ফলাফল আমকে তিনি বাসাই পড়িয়ে উপপুক্ত করে মাত্র ৫.৫ বছর বয়সে ক্লাস ২ তে ভর্তি করাই -যা অনেকেই বিলিভ করেনা এখনো। আমার নানুবাড়ির কাছে তখন মাদ্রাসা এবং হাইস্কুল দুইটাই ছিলো। কিন্তু, নানুর ইচ্ছেতে আমাকে মাদ্রাসাতেই ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো । আমাকে ইতিমধ্যে পবিত্র কুরআন শরিফ পড়ানো শেখাইছে আমার মামা। আমার আবছায়া স্মৃতিতে এখনো মাঝে মাঝে মামার সাথে ঘুরে ঘুরে কাইদা, ছিবারা পড়ি। এর বাইরে সেইসময়ের দুটো স্মৃতি ছাড়া কিছুই মনে পড়েনা এখন। একটা হলো ক্লাস টুতেই দৌড় প্রতিযোগিতাই দ্বিতীয় হওয়া, আর আরেকটা প্রতিযোগিতার প্রাইজ স্বরূপ একটা ছোট প্লাস্টিকের পট, যেটা আমি নানুকে নিয়ে এসে দিছিলাম।

ছোটবেলাই আমার পড়াশুনার স্টাইল ছিলো অন্যরকম। বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে সব টেক্সটবুক পড়ে ফেলতাম। বাকিসময় শুধু রিভাইস করতাম আর ক্রিকেট খেলতাম। কষ্টের কথা হলো, টেক্সট বইয়ের বাইরে যে একটা বিশাল বইয়ের জগত ছিলো তা আমার জানা ছিলোনা, বা কেউ কোনদিন তা জানানোর কথাও মনে করেনাই। আসলে আমার আসেপাশে কেউ জানলে না জানাবে। থাকলে হইতো বছরের বাকি নওয়মাস পড়তে পারতাম। গ্রামে তখন একটা ছেলে স্কুলের রেজাল্ট ভালো করতেছে এইটা দেখলেই সবাই খুশি থাকতো। এর বাইরে খেলাধুলা ভালো পারলে পরিবারের সবাই ভেবেই নিতো তার ছেলের বা মেয়ের ডেভোলপমেন্ট ঠিক হচ্ছে। সেই ধারাই, মাদ্রাসাই প্রতি ক্লাসে অনেক নাম্বারের ব্যবধানে প্রথম হওয়া, জেলা-থান ভিত্তিক বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পাওয়া, স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসের খেলা-ধুলাই দুএক্টা করে পুরষ্কার পাওয়া, বাকি সময় ঘুম-খাওয়া আর শুক্রবারে টেলিভিশন দেখা, এভাবেই আমার বড় হতে থাকা।

দেখতে দেখতে ক্লাশ সেভেন, এতদিনে খালামনির বিয়ে হয়ে গেছে, মামা নতুন বিয়ে করেছে। আমি আর নানুবাড়িতে আগের মতো পরিবেশ পেতামনা -হোক সেটা পড়াশুনার কিংবা মজা করার। প্রতি ইদে কপালে টিপ দিয়ে কেউ আর জোর করে স্টূডিওতে নিয়ে যেতোনা ছবি তুলতে। নতুন মামানি ভালোবাসতো -কিন্তু আগের মতো আর ছিলোনা কিছুই। আমি আমার ছোটবেলার সেরা টিচার কে হারায়ে বাসায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। ততদিনে আমার ছোট টা বড় হয়ে গিয়েছে; অন্যদিকে আব্বুর এক এক্সিডেন্টে চাকরির আরলি রিটায়ারমেন্ট হয়ে গেছে।

আমি বাড়ি ফিরলাম। বাসা থেকেও আমার স্কুল-মাদ্রাসা দুইটাই কাছে। এবার এক দৌড়ে যাওয়া যায়। আব্বুর ইচ্ছেতে এখানেও মাদ্রাসাই ভর্তি হতে হলো। শিখতে লাগলাম আরবি ব্যকরন, কুরআন আর হাদিসের অল্প স্বল্প তরজমা আর খানিক ব্যাখ্যা। তবে, সবকিছুর উপরে ফিকহ শাস্ত্র আমার ভালো লাগতে শুরু করলো। আমার কাছে তখন থেকেই লজিকাল জিনিস্পাতি ভালো লাগার শুরু। এদিকে, বাড়ির মাদ্রাসাতে প্রথম বছর ফার্স্ট হতে না পারলেও অষ্টম শ্রেনীর বৃত্তি পরীক্ষাই থানাতে প্রথম স্থান অধিকার করলাম।

আগেরদিনে বৃত্তি পরীক্ষা আলদা করে হতো, মাদ্রাসার ফাইনাল পরীক্ষার সাথে কোন সম্পর্ক ছিলোনা। হঠাৎ একদিন খবর পাওয়া যেতো বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিছে। সেটা আজকাল্কার সোশাল মিডিয়া না থাকলেও, সেকালে ছড়িয়ে পড়তো গ্রাম থেকে গ্রামে-লোকমুখ যে ছিলো অনেক বড় মুখ। বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্টে নিজের চেয়ে নিজের পরিবারের সবার খুশি দেখতেই আমার ভালো লাগতো। আনন্দ যে খুব ঠুনক জিনিস তা বুঝতে পেরেছিলাম এই সময়ে। রিয়ালাইজ করতে পারি, আপনি যতই বড় কিছু আচিভ করেন -তার হ্যাপিনেসটা থাকবে খুবি খুবি কম সময়। যাইহোক, সবকিছু ভালোভাবে চললেও টেক্সটবুক এর বাইরে তখনো আমার ছুয়ে দেখা হইনাই একটি খানাও বই (ফিকশন, ননফিকশন, কমিক, সাই-ফি বা যাই বলেন আপনি) । শেখা হইনাই ইংলিশ গ্রামার বা আডভান্স রাইটিং এর মতো বিশেষ স্কিলগুলো ও।

সাল ২০১০, ক্লাশ নাইন, আমি দেখলাম মাদ্রাসা ভর্তি হলে বায়োলজি অথাবা উচ্চতর গনিত দুটোর একটা নিতে পারবো। কিন্তু, আমার দুইটাই ভালো লাগে। অন্যদিকে, হাইস্কুলে দেখলাম দুইটাই নেওয়া যাবে -একটা থাকবে মেইন সাব্জেক্ট আরেকটা ইলেক্টিভ। এইটা দেখে ফেব্রুয়ারি মাসে বাসায় জেদ লাগালাম -আমি হাইস্কুলে ভর্তি হবো, আদার ওয়াইজ পড়াশুনা করবোনা। আব্বুকে এইটা বুঝাতে চলে গেলো ফেব্রুয়ারি মাসটাও। ফাইনালি, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে ভর্তি হলাম হাইস্কুলে গিয়ে। যথারিতী হাইস্কুলের ফ্রেন্ড এবং কিছু টিচারের দ্বারা বুলিড হলাম -‘মাদ্রাসার ছাত্র আরবি ছাড়া আমি কিছুই পারিনা’ এমন একটা ধারনা তাদের। যাইহোক, তাদের কথা গায়ে না মেখে জীবনে প্রথম বারের মতো ইংরেজি ব্যকরন শিখা শুরু করলাম -যেটা ছিলো অন্য এক অভিজ্ঞতা আমার -রাগ, জেদ আর ইগো আমাকে পার করে দিয়েছে সেই যাত্রাই, সাথে ছিলো মহান আল্লাহ তায়লার অশেষ রহমত। সবকিছুকে আড়াল করে নতুন স্কুলে দশম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বসলাম। টিচাররা সবাই আমাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করল -যারা কদিন আগেই বুলিড করতো। যেটা আমাকে রিয়ালাইজ করালো -আপনি আলোর মতো জললে সবাই নিয়ে মেতে থাকবে, কিন্তু ভল্টেজটা একটু কমলেই আপনাকে রিপ্লেশ করার ব্যবস্থা খুজবে।

টেক্সটবুক ভিত্তিক প্রতিযোগিতার আড়ালে বই পড়া, ধরা বা ছুয়ে দেখা তখনও রয়ে গেলো আগের মতই। আমাদের স্কুলে কোন লাইব্রেরি ছিলোনা। গ্রামের প্রত্যন্ত যায়গায় স্কুল -বিজ্ঞানের মাস্টারই যেখানে পাওয়া যেতোনা, সেখানে লাইব্রেরিতে বসে হুমাউন কিংবা আখতারুজ্জমান ইলিয়াসের উপন্যাস পড়াটা আমার কাছে না দেখা-না জানা স্বপ্নই রয়ে গেলো। ক্রিকেট, নামে মাত্র স্কুল আবার ক্রিকেট এভাবেই যাইতে লাগ্লো জীবন। যদিও সেকালে কোন প্যারা ছিলানা, ছিলোনা কোন ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা। আই জাস্ট ইঞ্জয়েড মাই পেজেন্স।

স্কুল পাশ করে শহরে চলে আসলাম। রেসালট এর পাশাপাশি নাম্বার ভালো থাকাই তখনকার রাজশাহী বোর্ডের সেরা কলেজ, নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজ, এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম। কলেজে ছিলো অনেক বড় একটা লাইব্রেরি -সুন্দর সাজানো-গুছানো। পাওয়া যেতো সেখানে পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং বিভিন্ন রাইটারের বই। মাঝেমাজে যাওয়া হতো, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকতো ভিন্নঃ ক্লাশ ফাকি দেওয়া অথবা সুন্দরি কোন বই পড়ুয়া বান্ধবিকে দেখা। শূন্তে অড লাগ্লেও বিষয়টা এমনি ছিলোঃ বয়স তখন অন্য এক যায়গায় -সবকিছু সোনালী মনে হতো। এইভাবে, প্রাইভেট, ল্যাব আর খেলাধুলার বাইরে ইণ্টারমিডীয়েটও যাওয়া হলোনা বইয়ের জগতে। তবে, এবার সুযোগ পেয়েও পারলামনা।

আসলে আমি জান্তামইনা বই পড়ার গুরুত্বটা। আমার বন্ধু নাহিদ দেখতাম কলেজের লাইব্রেরিতে বসে শারলক হোমস আর রবিনহূড পড়তো- বাংলা আর ইংরেজি ক্লাস ফাকি দিয়ে। আমার দেখে মনে হতো এগুলো টাইম লস। এরচেয়ে বরং সাইকেল নিয়ে শহরটা চক্কর দেওয়া বা ম্যেডিকাল মাঠে বিকেলের ক্রিকেটাটা টানতো অনেক বেশি করে। দেখতে দেখতে জীবনের সোনালী দুবছর শেস করে পাশ করে বের হলাম, রিতীমত রেজাল্ট এখানেও ভালো করলাম। এর পরপরই শুরু হলো এডমিশন এর প্যারা। এডমিশনে এক বড় রকমের সিদ্ধান্ত ভুল করে ম্যডিকেল এ চান্স পেলামনা। সে গল্প নাহই আরেকদিন করা যাবে।

শেষে, রাজশাহী ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে বাসাই এসে ক্লিনিকাল ডিপ্রেশঙ্কে ইঞ্জয় করা শুরু করলাম। কারো সাথে কথা বলে ইচ্ছে হতোনা। এতো ভালো কলেজে পড়ে রাজশাহীর বাইরে যাইতে পারলাম্না -এই ভাবনাটা আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতো। শুধু খাইতাম আর দিন-রাত মিলে ১৩-১৪ ঘন্টা ঘুমাতাম। ফলাফল এক মাসে ওজন বাড়ল ১৩ কেজি। স্ট্রেস মানুষের ওজনও বাড়াই সেটা আবিষ্কার করলাম সবে মাত্র। পরে অবশ্য জেনেছি কিভাবে তা হই -স্ট্রেস এ মানুষ প্রপার স্লিপ সাইকেল কমপ্লিট করতে পারেনা, ফলে ক্ষুধা থাকে অনেক বেশি। প্রয়োজনের বাইরে ক্ষুধা আর অসময়ের ঘুম ওজন বাড়াই দাপ দাপ করে। দিন গড়িয়ে রাত, রাত গড়িয়ে দিন -এভাবে সপ্তাহ, মাস যেতে লাগ্লো। দুর্ভাগা আমি, এই ফাকা সময়টাতেও বই পড়া শুরু করতে পারলামনা। কি আর করার ভাগ্যের লিখন আর নিজের অজ্ঞতা। ডিসেম্বরে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হলো ক্লাশ- প্রথমদিকে সবকিছু সোনালি মনে হলেও, কিছুদিন পর এডমিশন এর ব্যর্থতা জাপ্টে ধরলো আমাকে আবার। ডিপ্রেশনে আমার কোন কিছুই ভালো লাগতোনা- না বন্ধু না নতুন কোন জায়গা। সব অন্ধকার লাগতো -মনে হতো জগতে আমি সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ। আমাকে দিয়ে কিছু হবেনা।

সাল ২০১৫, ডিশেম্বরের শীত। জীবনে প্রথম বারের মত মনে হলো মানুষ কেনো বই পড়ে, দেখিতো আমি একটু চেষ্টা করে ভালো লাগে কিনা। নিজের কাছে টাকা ছিলোনা। আমার রুম্মেট এর কাছে ৫০০ টাকা ধার করে বাজারে গেলাম। বাজারে গিয়ে কিনে নিয়ে আসলাম পাউলো কয়েলহোর Alchemist আর নরমান ভিন্সেন্ট পিলের You Can If You Think You Can. বই দুটো কেনো চুজ করলাম জানিনা- বাট আসার পরপরই পড়া শুরু করলাম। প্রথমটা ছিলো সহজ সাবলিল মজার একটা ফিকশন, পরেরটা এনার্জি বুস্টিং -যেটা আমার খুব করে দরকার ছিলো। বই দুটো পড়তে পড়তে বুঝে গেলাম, আমি মনে হই পাইছি আমার নতুন ঔষধ। নতুন এক ‘বন্ধু’ যাকে আমি চাইলেই পড়তে পারি পুরোটা। আমার ভিষন অন্ধকারে বই হয়ে আসলো এক আলো হয়ে। আমার গত এক বছরের নেগেটিভ এনার্জি গুলো কমতে থাকলো -আর সেগুলোকে রিপ্লেস করতে শুরু করলো পজিটিভ এনার্জি। হারিয়ে যাওয়া আনন্দ, খেলার মাঠে ভালো লাগা কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া সবকিছুতে মজা পাওয়া শুরু করলাম আবার। নিজের মধ্যকার ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স কমা শুরু করলো। জীবন ফিরে পেতে লাগ্লো নতুন হরমোন যার কারন রিডিং ফর প্লেজার । বাচতে লাগ্লাম আবার বর্তমানে। বই পড়া নিয়ে এ সিরিজ চলবে….

Share this content

amithasan

Hello! I am Amit Hasan. A Biotech Graduate; Research is my profession; Writing is my passion; Reading is my obsession. I love to travel and meet interesting people. I often write my thoughts here with some letters and sentences. You are welcome to my intellectual world.

This Post Has 2 Comments

  1. সুন্দর সাবলিল লিখনি, কিছু বানান ভুল আছে, হয়ত সময় পেলে ঠিক করবেন। পরের কাহিনীর অপেক্ষায় 🥺

Leave a Reply